নতুন মায়েদের বিপদজনক রোগঃ প্রসব পরবর্তী মনোব্যাধি (Psychiatric disorders in puerperium)

সর্বশেষ সম্পাদনা: ২৩ অক্টোবর ২০২০, বিকাল ০৪:৫৬

আমাদের দেশে প্রেগনেন্সিকে খুব সহজ, স্বাভাবিক একটা ব্যাপার মনে করা হয়। অনেক মা-ই অপরিকল্পিতভাবে ঘন ঘন সন্তান জন্ম দিতে দিতে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। আমাদের দেশে একজন মায়ের গর্ভাবস্থায় ও প্রসব পরবর্তী পুষ্টি ও যত্নের ব্যাপারটাই অবহেলিত। সেখানে মানসিক স্বাস্থ্যের (মানসিক চাপ বা মানসিক রোগ বা অন্য যেকোন বিষয়) ব্যাপারটা কতোটুকু গুরুত্ব পায় তা সহজেই অনুমান করা যায়। অথচ গর্ভাবস্থায় মানসিক চাপ বা মানসিক রোগ থেকে বাচানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকা দরকার। যেন কোন প্রকার প্রসব পরবর্তী  মনোব্যাধি (psychiatric disorders in pureperium) তৈরি না হয়। 

প্রসব পরবর্তী বিষন্নতা (postpartum psychosis)এর কারণ কি? কেন হয়?

একজন মায়ের জন্য গর্ভধারণ (pregnancy) একটি আনন্দের ব্যাপার। তবে কখনো কখনো আবেগের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয় এবং মা অবসাদগ্রস্ত (fatigued/exhausted) হয়ে পড়েন। আবার কেউ বিষণ্ণতা (depression)-এ ভোগেন। সন্তানের আগমনের অপেক্ষায় থাকা মা সন্তানের সুস্থতা ও সঠিকভাবে বেড়ে ওঠা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হতে পারেন। কন্যা শিশু জন্মদান নিয়ে হীনমন্যতাতেও ভোগেন কেউ কেউ (যা পুরোটাই  পারিবারিক ও সামাজিক চাপ থেকে তৈরি)।

pregnant lady

আবার লেবার পেইনের ভয়, সিজারের আতংক, প্রেগনেন্সিতে ওজন বৃদ্ধি (অর্থাৎ বডি ইমেজ) নিয়ে হীনমন্যতা আসতে পারে। একজন মায়ের হরমোনের তারতম্যের কারণে আবেগের উঠা নামা এবং ঘন ঘন মুড পরিবর্তন (mood swing) হয় বলে এমন সুন্দর একটি  সময়েও মানসিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।

কোনো কোনো গবেষকের মতে প্রেগনেন্সি নিজেই একটি চাপ (stressor – situation that gives worry and tension)। অনেক সময় দেখা যায়, পরিবারের অসহযোগিতা, অযত্ন, পারিবারিক কলহের জের, আর্থিক সমস্যা ও সামাজিক জটিলতা এরূপ পরিস্থিতি তৈরি করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কর্মজীবী মায়েদের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় পর্যাপ্ত যত্ন ও বিশ্রামের অভাব, সন্তান পালনের জন্য পর্যাপ্ত ফ্যামিলি সাপোর্টের অভাব ও নানাবিধ দুশ্চিন্তা থেকেও মানসিক অসুস্থতার জন্ম হতে পারে। বাংলাদেশের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, শতকরা ৮৫ ভাগ নারীরই প্রেগনেন্সিতে মুড চেঞ্জের সমস্যা দেখা দেয় । womensmentalhealth.org এর সূত্র মতে, শতকরা ২০ ভাগ নারী প্রেগনেন্সিতে মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। যদিও এর মাঝে আগে থেকে মানসিক রোগী এরকম অনেকেও আছেন।

প্রসবপরবর্তী বিষন্নতা (postpartum depression) রোগীদের প্রায় অর্ধেকের বাইপোলার ডিসঅর্ডার (bipolar disorder)-এর মত রোগ থাকতে পারে। তবে, অনেক সময়ই তাদের ক্ষেত্রে তেমন কোন মানসিক সমস্যার ইতিহাস পাওয়া যায় না।  প্রসব পরবর্তী মনোব্যাধি (psychiatric disorders in puerperium) সম্পর্কে সব কিছু এখনো মানুষ জানে না। তবে এটুকু পরিষ্কার, এটা একটা মেডিকেল ইমার্জেন্সি। সন্দেহ হলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা শুরু করা জরুরি। 

কখন শুরু হয়?

প্রসব পরবর্তী তিন মাস মানসিক অসুস্থতার জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। ঘুম না হওয়া, প্রেগনেন্সির শেষের দিকে  হরমোনের আধিক্য ও সন্তান জন্মদানের পর হঠাৎ কমে যাওয়াকে এর কারণ হিসেবে ভাবা হয়। এছাড়া যাদের পরিবারের নিকট সদস্যদের মধ্যে কারো কোনো মেজর সাইকিয়াট্রিক ডিজিজ রয়েছে বা আগে ভুগেছেন ও চিকিৎসা নিয়েছেন কিংবা ঔষধ অনিয়মিত গ্রহণের কারণেও পোস্ট পারটাম মেন্টাল ইলনেস হতে পারে। কম বয়সী মা, সিজারিয়ান ডেলিভারি, কষ্টকর নরমাল ডেলিভারি, নবজাতকের মৃত্যু অথবা কোনো জটিলতা থেকেও এমন হতে পারে।

বলা হয় যে, ৫০% মা, ডেলিভারি পরবর্তী ৩-৪ দিন পর থেকে  puerperal blue বা baby blue তে আক্রান্ত হন, যা কয়েক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। প্রতি ১০ জনে ১-২ জন প্রসব পরবর্তী বিষন্নতা (postpartum depression-PPD) এ আক্রান্ত হতে পারেন। এটা বেবি ব্লু থেকে বেশি তীব্রতর ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এক্ষেত্রে অবসাদ, হতাশা, ভয়, অসহায়ত্ব, অল্পতেই কান্না আসা, ঘুম না হওয়া, মেজাজ খিটখিটে হওয়া ইত্যাদি দেখা দিতে পারে। এমনকি কখনো কখনো মা নিজের সন্তানকেও সহ্য করতে পারেন না! পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন (postpartum depression) থেকে আত্মহত্যার প্রবণতা পর্যন্ত তৈরি হতে পারে। বলা হয় যে পরবর্তীতে পুনরায় গর্ভধারণে এর  ফিরে আসার ঝুঁকি অনেক বেশি, ৫০-১০০%।এছাড়া আছে প্রসব পরবর্তি দুশ্চিন্তা (postpartum anxiety), আবার প্রসব পরবর্তী শুচিবায়ুর মত রোগ (postpartum obsessive compulsive disorder) দেখা দিতে পারে। এছাড়া এ সময় আগে থেকে থাকা মনোরোগএর তীব্রতা বেড়ে যেতে পারে।

প্রসব পরবর্তী মনোব্যাধি (postpartum psychosis) এগুলোর মধ্যে খুবই আনকমন (হাজারে একজন মায়ের এটা দেখা দিতে পারে) এটি এতোটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে,আত্মহত্যা তো বটেই সন্তানকে হত্যা করার মতো মানসিক অবস্থা তৈরি হতে পারে।খুবই বিপদজনক মনোরোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে তাৎক্ষনিকভাবে চিকিৎসা শুরু করা জরুরি।সন্তানকে মায়ের কাছ থেকে পুরোপুরি দূরে রাখার প্রয়োজন পড়তে পারে এবং nursing supervision এর প্রয়োজন পড়তে পারে। সাধারণত প্রসবের বেশ কিছুদিন পর বা সপ্তাহ খানেক পর থেকে এটা শুরু হয়।  তবে, কয়েক সপ্তাহ পরেও শুরু হতে পারে। এর লক্ষণও বিভিন্নরকম হতে পারে। এমনকি কারো কারো হ্যালুসিনেশন,ডিলিরিয়েম অত্যাধিক জেগে থাকার প্রবণতা দেখা দেয়।

 

don't give up you matter

প্রসবপরবর্তী মানসিক অসুস্থতা নবজাতকের উপর কতো টুকু বিরূপ প্রভাব ফেলে?

১। কোনো কোনো গবেষকের মতে, গর্ভাবস্থায় মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রভাবে গর্ভস্থ শিশুর নানা ধরনের  জটিলতা তৈরি করতে পারে।বাংলাদেশ জার্নাল অফ অবসটেট্রিটক্স এন্ড গাইনোকলজির মতে,৪,০০,০০০ শিশুর জন্ম ডিপ্রেশন আক্রান্ত মায়ের গর্ভে।

২। যদিও মাতৃদুগ্ধ পানে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই,তবে ম্যানিয়া বা ম্যানিক ডিসঅর্ডারের চিকিৎসার্থে ব্যবহৃত ঔষধ শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বিধায় সাবধানতা অবলম্বন করা আবশ্যক বলা হয়েছে।

বলা হয়, prevention is better than cure.
 
তাই, প্রেগনেন্সির সময় পরিবারের সদস্যদের বিশেষ করে স্বামীর সহযোগিতা ও মানসিক সাপোর্ট প্রত্যেক মায়ের অধিকার বলে আমি মনে করি। সমস্যা শুরু হবার পর পাত্তা না দেয়া বা লুকিয়ে রাখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা খুবই জরুরি। কাউন্সিলিং,পুষ্টিকর খাবার,পর্যাপ্ত ঘুম চিকিৎসা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
 
সুষম খাবার,পর্যাপ্ত বিশ্রাম,ফ্যামিলি সাপোর্ট,মানসিক প্রশান্তি ও যৎসামান্য রিলাক্সেশনের সুযোগ প্রতিটি মায়ের প্রাপ্য।
মূলত: আমাদের দেশে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতনতা আরো বেশি বেশি প্রয়োজন।

এই বিষয়ে আরো জানতে চাইলে প্রশ্ন করুন বা মন্তব্য করুন।

    Leave a Comment