সর্বশেষ সম্পাদনা: ৭ জানুয়ারি ২০২১, বিকাল ০৪:০০

নবজাতক শিশুর যত্নের খুঁটিনাটি

একটা সদ্যোজাত শিশু/নবজাতক পরিবারকে সম্পুর্ণ করে। বাবা-মায়ের মনকে আনন্দে ভরে দেয়। অবশ্য আনন্দের সাথে সাথে অনেক সন্দেহ/দুশ্চিন্তাও তৈরি করে। বাচ্চা কি পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে? পর্যাপ্ত ঘুম হচ্ছে? অমুকের বাচ্চাতো অনেক ছোট আমার বাচ্চা কি বেশি বড়? বাচ্চা কেন কান্না করছে ইত্যাদি নানা ধরণের প্রশ্ন তৈরি হয় মা-বাবার মনে। বিশেষ করে যদি প্রথম বাচ্চা হয়। সব সময় চিকিৎসকদের কাছে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। গেলেও সব কিছু জেনে নেয়ার কথা মনে থাকে না বা সময়ই পাওয়া যায় না। আর, নানী-দাদী বা প্রতিবেশিরা এতরকম পরামর্শ দেয় যে তা থেকে সিদ্ধান্ত নেয়াও কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। এই বিভিন্ন ধরণের সন্দেহ থেকে কিছুটা মুক্তি দিতেই এই প্রবন্ধ।  

প্রবন্ধটি বেশ বড়। পুরোটা এক বসায় পড়লে তো খুবই ভালো, নইলে নিচের সূচীপত্র থেকে পছন্দের বিষয়টি ক্লিক করে পড়ে নিতে পারেন।

সূচীপত্র

নবজাতক কাকে বলে?

জন্মের পর থেকে ২৮ দিন পর্যন্ত শিশুকে নবজাতক বলা হয়।

এই সময়টুকু শিশুর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশেষ যত্ন প্রয়োজন হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের নবজাতকেরা/সদ্যোজাত শিশুরা কেমন আছে?

বর্তমানে বাংলাদেশে শিশু মৃত্যুর হার কত? ইউনিসেফ এর দেয়া তথ্য মতে বর্তমানে বাংলাদেশের নবজাতক মৃত্যুর হার ১৯। অর্থাৎ ১০০০ জন জীবিত জন্মে ১৯ জন নবজাতকের মৃত্যু ঘটে থাকে। বাংলাদেশের ৫ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যু হার ৩১ জন (প্রতি ১০০০ জন জীবিত জন্মে) অর্থাৎ ৫ বছরের কম বয়সী শিশুর যারা মারা যায় তাদের মধ্যে ৬১% মারা যায় প্রথম ২৮ দিনে। এটাই প্রমাণ করে নবজাতকের মৃত্যু আমাদের জন্য কত বড় সমস্যা। এ কারণে নবজাতকের যত্নের বিষয়ে সবাইকেই খুব সচেতন থাকতে হবে।

নবজাতকের বিপদ চিহ্ন

নবজাতক খুবই স্পর্শকাতর (sensitive) থাকে। এবং যেকোন অসুস্থতার লক্ষণ খুবই মৃদু (subtle)  হয়ে থাকে। এজন্য সচেতন থাকতে হবে। মোটা দাগে কয়েকটি বিষয়ে লক্ষ্য রাখা জরুরী। এগুলোর নাম দেয়া হয়েছে ‘নবজাতকের বিপদ চিহ্ন’ (Danger Sign) । নিচের বিপদ চিহ্নগুলো আছে কিনা খেয়াল রাখতে হবে-

১। বুকের দুধ টানতে না পারা বা না চুষতে পারা

২। জ্বর হওয়া বা শরীর স্বাভাবিকের চেয়ে ঠান্ডা হয়ে চাওয়া

নবজাতকের বিপদ চিহ্ন

৩। দুর্বল হয়ে পড়া। এর ফলে বাচ্চা নড়াচড়া বন্ধ করে দিতে পারে।

৪। খিচুনি হওয়া (convulsion)

৫। নাভি পেকে যাওয়া। এর ফলে নাভির চারপাশটা লাল হয়ে যেতে পারে এবং একই সাথে অনেক সময় নাভি থেকে দুর্গন্ধও বের হতে পারে।

৬। দ্রুত শ্বাস নেয়া বা বুকের খাঁচা দেবে যাওয়া (chest indrawing)

এগুলো বা এরকম যেকোন লক্ষণ দেখা দিলে বা এমনকি সন্দেহ দেখা দিলেও একজন নবজাতক বা শিশু বিশেষজ্ঞকে দেখিয়ে নিবেন।

স্বাভাবিক নবজাতক কেমন হয়?

স্বাভাবিক নবজাতক জন্মের পর পরই কান্না করে এবং শ্বাস নেয়। ওজন থাকে ২৫০০ গ্রাম হতে ৩৯৯৯ গ্রাম। অর্থাৎ ২৫০০গ্রামের নিচে হলে কম এবং ৪০০০ গ্রাম বা তার চেয়ে বেশি হলে বাচ্চার ওজন বেশি।  স্বাভাবিক অবস্থায়ই পায়খানা (প্রথম যে কালো পায়খানা করে সেটা) করতে ২৪ ঘন্টা সময় লাগতে পারে। চিন্তা করার কিছু নাই। অন্যদিকে, প্রথমবার প্রস্রাব করতে ৪৮ ঘন্টা সময় লাগতে পারে। উল্লেখিত সময়ের মধ্যে পায়খানা (১ দিন)/প্রস্রাব(২ দিন) না হলে অবশ্যই চিকিৎসকের স্বরনাপন্ন হবেন।

নবজাতকের খাবার

নবজাতকের প্রথম খাবার হতে হবে শালদুধ। শালদুধের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে রোগ প্রতিরোধকারী শক্তি থাকে। এজন্য শালদুধ বাচ্চাকে শক্তি দেয়ার সাথে সাথে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও দেয়। এ কারণে শালদুধকে শিশুর প্রথম টিকা বলা হয়। শালদুধের পরিমাণ কম মনে হতে পারে। কিন্তু এটুকুই যথেষ্ট। বাড়তি কোন কিছু প্রয়োজন নাই। 

প্রথম খাবার অবশ্যই প্রথম ঘন্টার মধ্যে দেয়া দরকার। ভালো হয় যদি ৩০ মিনিটের মধ্যে দেয়া যায়। এই সময় বাচ্চার চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। এই সময় শালদুধ খেলে এক দিকে শিশুর চাহিদাপুরণ হয় অন্যদিকে মায়ের জরায়ু (Uterus) সংকোচনের মাধ্যমে দ্রুত রক্তপাত বন্ধ হয়ে যায়। এজন্য এই এক ঘন্টা সময়ের নাম দেয়া হয়েছে ‘গোল্ডেন ওয়ান আওয়ার’ (Golden 1 hour) বা ‘সোনালি একটি ঘন্টা’। শালদুধের আরো একটি সুবিধা হলো এতে কালো পায়খানাটাও (meconium) দ্রুত হয়ে যায়। এর ফলে বাচ্চার জন্ডিসের মাত্রা কম থাকে।

শালদুধ শুরুর দিকে আসে এবং পরিমাণে কম হয়। তবে, নবজাতকের জন্য এটা খুবই উপকারী।

মায়ের ঠান্ডা/কাশি থাকলে কি বুকের দুধ খাওয়ানো যায়?

যায়। মায়ের ঠান্ডা/কাশির জীবানুর বিরুদ্ধে মায়ের শরীরে যে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় সেটা বুকের দুধের সাথে সাথে নবজাতকের শরীরে চলে আসে। এবং নবজাতককে প্রতিরোধ ক্ষমতা দেয়। এ কারণে মায়ের শরীরের ইনফেকশন থেকে নবজাতকের ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে। তবে, এক্ষেত্রে বুকের দুধ খাওয়ানোর আগে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিতে হবে।

তবে, মায়ের যদি জন্ডিস, যক্ষা (tuberculosis), পক্স (chicken pox), থাইরয়েডের সমস্যা ইত্যাদি থাকে তাহলে চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে নিন। একইভাবে মা যদি ক্যান্সার আক্রান্ত থাকে এবং কেমোথেরাপি দেয়ার মধ্যে থাকে তাহলেও চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করুন।

আমার বাচ্চা যথেষ্ট পরিমাণে দুধ পাচ্ছে কিনা কিভাবে বুঝব?

বুকের দুধ খাওয়ানো একটা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। সাধারণত এতে কোন সমস্যাই হয় না। তারপরও সন্দেহ হতেই পারে, বিশেষ করে প্রথম বাচ্চার ক্ষেত্রে। 

বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় বাচ্চা দুধ পাচ্ছে কিনা। বাচ্চা দুধ ঠিকভাবে পেলে বড় বড় ঢোক নেয়। এই সময় গালটাও কমবেশি ফোলা থাকে। অনেকক্ষেত্রে মা বাচ্চার ঢোক গেলার শব্দ শুনতেও পায় । এ সময় বাচ্চা শান্ত থাকে এবং খাওয়া শুরু করার কিছুক্ষণ পরই হাতপা নিয়ে খেলতে থাকে। অন্যদিকে, যদি দুধ না পায় তাহলে শুরু থেকেই বাচ্চা কান্নাকাটি শুরু করে, অস্থির হয়ে যায়, বার বার বাচ্চা চুষতে থাকে। এই সময় স্তন আকড়ে ধরে জোড়ে জোড়ে চোষার চেষ্টা করে। গালটাও ভিতরের দিকে দেবে যায়।

বাচ্চা যদি বুকের দুধ ঠিকভাবে পায় তাহলে নিচের লক্ষণ পাওয়া যাবেঃ

১। সারাদিনে ৬-৮ বার প্রস্রাব করবে ( প্রথম ২ দিনের কথা আলাদা)

২। ধীরে ধীরে বাচ্চার ওজন বাড়বে- উল্লেখ্য জন্মের প্রথম ৭ দিনে বাচ্চার ওজন কমে। 

যদি এমনটা না হয় তাহলে বাচ্চা দুধ হয়ত ঠিকভাবে পাচ্ছে না। সেক্ষেত্রে, সবার আগে ঠিক করতে হবে বাচ্চাকে কোলে নেয়া (position) ও বাচ্চাকে বুকে দেয়ার পদ্ধতি (attachment) হয়ত ঠিক হচ্ছে না।  অনেক ক্ষেত্রেই বাচ্চাকে কোলে নেয়ার পদ্ধতি (position) এবং বুকে দেয়ার(attachment) পদ্ধতি সঠিক না হওয়ায় বাচ্চা পর্যাপ্ত দুধ পায় না। পজিশন ও এটাচমেন্ট সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন। পুরো বিষয়টি ভালো ভাবে বুঝে নিতে পড়ে নিতে পারেন মায়ের বুকের দুধ কম হওয়ার কারণ ও বৃদ্ধির উপায়এই প্রবন্ধটি। এরপরও প্রশ্ন থাকলে আমাদের জিজ্ঞাসা করুন অথবা একজন নবজাতক বিশেষজ্ঞএর পরামর্শ নিন।

নবজাতকের গায়ের রং

নবজাতকের গায়ের রংএ গোলাপি গোলাপি ভাব থাকে। বিশেষ করে যদি গায়ের রঙ ফর্সা হয়ে থাকে। তবে, অনেক সময়  হাত এবং পা একটু নীলাভ হতে পারে। বিশেষত শরীর যদি একটু ঠান্ডা থাকে। শরীর ভালোভাবে গরম হলে এমনটা সাধারণত থাকে না। 

যদি জিহবাসহ সারাশরীর নীলাভ থাকে (নবজাতকের বিপদ চিহ্ন) তাহলে অতিসত্ত্বর একজন নবজাতক বা শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

নবজাতকের জন্ডিস

বেশিরভাগ নবজাতকের সামান্য পরিমাণে জন্ডিস দিতে পারে। সময়ের সাথে সাথে আবার ভালোও হয়ে যায়। তবে, মাত্রা বেশি হলে, বা ১ম দিন থেকে জন্ডিস দেখা দিলে বা জন্ডিস দীর্ঘস্থায়ী হলে নবজাতক বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করুন। উল্লেখ্য, পুরনো ধারণা ছিল নবজাতককে রোদে রাখলে তার জন্ডিস কমে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে রোদে দেয়ার ফলে জন্ডিস খুব একটা কমে না। কিন্তু এর ফলে নবজাতকের চামড়া পুড়ে যাওয়া, পানিশূন্যতাসহ অন্যান্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ কারণে এখন জন্ডিসের চিকিৎসার জন্য নবজাতককে রোদে দেয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

newborn jaundice
অনেক সময় নিজের চামড়ার রঙ এর সাথে মিলালে জন্ডিস বোঝা যায়

নবজাতকের চোখের যত্ন

জন্মের পর পর নবজাতকের চোখের পাতাগুলো একটু ফোলা ফোলা থাকতে পারে। এবং সাধারণত আলোতে চোখ খুলে না। চোখের সাদা অংশটাও একটু নীলচে ভাবও থাকে অনেক সময়। এ সবই স্বাভাবিক। তবে, চোখের মনি সাদা থাকলে বা অন্য কোন অস্বাভাবিকতা থাকলে দ্রুত নবজাতক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

নবজাতকের ত্বকের যত্ন

নবজাতকের ত্বকের উপর একটা হালকা স্তর থাকে (vernix caseosa) । এটা বাচ্চার শরীরকে গরম রাখে এবং ইনফেকশন থেকে প্রতিরক্ষা দেয়। এটাকে সড়ানোর প্রয়োজন নাই। এটা কয়েকদিন পর আপনা থেকে চলে যায়। পরবর্তী সময়ের জন্য বাচ্চার চামড়ার আর্দ্রতা বজায় রাখার জন্য অলিভ ওয়েল বা ভালো মানের ময়শ্চারাইজিং ক্রিম ব্যবহার করা যায়।

নবজাতকের গোসল

জন্মের পর প্রথম ৩ দিন (বা, ৭২ ঘন্টা) গোসল করানোর প্রয়োজন নাই। এ সময় গোসল করালে গায়ের উপরে থাকা সাদা আবরনীটা চলে যায়। এছাড়া নবজাতককে তাপমাত্রার উঠানামার সাথে অভ্যস্ত হতে একটু সময়ও দেয়া দরকার ( মায়ের গর্ভে তো সে সারাক্ষণ একই তাপমাত্রার কুসুম গরম পানির মধ্যে ছিল)। 

এর পর থেকে ২/৩ দিন পর পর কুসুম গরম পানিতে গোসল করানো যেতে পারে। সাধারণ সাবান নবজাতকের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে না। সাধারণ সাবানের অতিরিক্ত ক্ষার ত্বককে বেশি শুষ্ক করে ফেলে। প্রয়োজনে নবজাতকদের জন্য তৈরি করা বিশেষ সাবান ব্যবহার করা যেতে পারে। গোসলের পর সুতী কাপড় দিয়ে শরীর মুছে কাপড় পড়িয়ে দিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যেন শরীর ঠান্ডা না হয়ে যায়।

নবজাতকের কাপড়

নবজাতকের ত্বক খুবই স্পর্শকাতর। এজন্য, মোটা, শক্ত, কৃত্রিম তন্তু আছে এমন কাপড় ব্যবহার না করাই ভালো। এগুলো থেকে ত্বকে ক্ষত হতে পারে। একইসাথে অনেক ক্ষেত্রে এলার্জিও হতে পারে। এজন্য সুতি কাপড় ব্যবহার করা ভালো। অন্য আরেকটা বিষয় খেয়াল রাখা দরকার। নতুন কাপড়ে তৈরির সময় বিভিন্নরকম রাসায়নিক, রঙ ইত্যাদি দেয়া থাকে (কাপড়কে উন্নতমানের ও আকর্ষনীয় দেখানোর জন্য)। এজন্য ভালো করে ধুয়ে ব্যবহার করা উচিত।

নবজাতকের ঘুম

নবজাতক সাধারণত প্রথম কয়েকদিন দিনে প্রায় ১৮-২০ ঘন্টা ঘুমায়। এটাই স্বাভাবিক। এবং অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় সারাদিন নিজে তো ঘুমায়, কিন্তু রাতে মাকে ঠিকভাবে ঘুমাতে দেয় না। এ কারণে ভালো হয় যদি মা তার নিজের ঘুমের রুটিনও বাচ্চার সাথে মিলিয়ে নেয়। অর্থাৎ বাচ্চা যখন ঘুমাবে তখন মাও ঘুমাবে এবং বাচ্চা যখন জাগবে তখন মাও জাগবে। মায়ের বিশ্রাম অত্যন্ত জরুরি। এজন্য পরিবারের সহযোগিতা জরুরি। কিছুদিন পর বাচ্চার রুটিন ঠিক হয়ে যায় এবং মায়ের কষ্টও কমে যায়।

প্রাসঙ্গিক হিসেবে উল্লেখ করি, প্রথম কয়েকটা দিন বিশেষ করে প্রথম বাচ্চার ক্ষেত্রে মায়ের শারীরিক, ইমোশনাল, হরমোনাল (hormonal) পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে মা অনেক ক্ষেত্রে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারেন। এই সময় পরিবারের সবার (বিশেষ করে স্বামীর) কাছ থেকে সমর্থণ/সহযোগিয়া পাওয়াটা খুবই জরুরি। এ সম্পর্কে আরও জানতে পড়ুন নতুন মায়েদের বিপদজনক রোগঃ প্রসব পরবর্তী মনোব্যাধি (Psychiatric disorders in puerperium) এই প্রবন্ধটি।

নবজাতকের টিকা

আগেই যেমন উল্লেখ করেছি শালদুধ শিশুর প্রথম টিকা। নবজাতকের রোগ প্রতিরোধের জন্য এটা জরুরি। এছাড়া আমাদের ইপিআই (EPI) শিডিউলএ থাকা BCG টিকাটিও জন্মের পর যতদ্রুত সম্ভব হয় দিয়ে দিলে ভাল। যদিও সাধারণত ৬ সপ্তাহ বয়স থেকে বাকিসব টিকার সাথেই এটাকে দেয়া হয়ে থাকে। বিসিজি টিকাটি যক্ষা (Tuberculosis)  থেকে প্রতিরক্ষা দেয়।

অন্যদিকে, যদি মায়ের হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ইনফেকশন থাকে সেক্ষেত্রে হেপাটাইটিসের টিকাও জন্মের পর পরই দিয়ে দিতে হয়। বিস্তারিত জানতে আপনার চিকিৎসকের সংগে ডেলিভারির আগেই আলোচনা করে নিন।

এখানে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা যায়।  যদি মায়ের রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ [যেমন- A negative, B negative, AB negative বা O negative) এবং নবজাতকের রক্তের গ্রুপ পজিটিভ  (A positive, B positive, AB positive বা O positive) হলে প্রত্যেকবার প্রসবের পর পরই মাকে একটা ইনজেকশন দিতে হয় (anti-D)। এটা না দেয়া হলে পরবর্তী বাচ্চার জন্মের পর পর  তীব্র জন্ডিস হতে পারে। এমন কি জন্মের আগেই জন্ডিস হয়ে বাচ্চা মায়ের গর্ভেই মারা যেতে পারে।

নবজাতকের পায়খানা

নবজাতক প্রথমবার পায়খানা করতে ২৪ ঘন্টা সময় নিতে পারে।এরপর থেকে দিনে ৩বার থেকে শুরু করে ৩/৪ দিনে একবার করে পায়খানা করতে পারে। প্রথম এবং তার পরবর্তী কয়েকবার পায়খানা কালো হতে পারে। এটা স্বাভাবিক। প্রথম ৬ মাস (যখন বাচ্চা শুধু বুকের দুধ খায়) পায়খানা সাধারণত নরম হয়ে থাকে এবং পায়খানার রঙও বিভিন্নরকম হয়ে থাকে। ৬ মাস বয়স হওয়ার পর থেকে যখন শিশু বড়দের মত খাবার খাওয়া শুরু করে তখন পায়খানাও বড়দের মত হয়ে যায়।

তবে, পায়খানা একদম পাতলা বা শক্ত হওয়ার কথা না। এমনটা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

গরমে নবজাতকের যত্ন

নবজাতক নিজের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রন করতে পারে না। ফলে, যখন ঘরের/পরিবেশের তাপমাত্রা বেশি থাকলে শরীর গরম হয়ে যায়। আবার আশেপাশের তাপমাত্রা কমে গেলে শরীরের তাপমাত্রা কমে যায়। এ কারণে নবজাতকের তাপমাত্রা বজায় রাখার জন্য সচেতন থাকতে হবে। গরমে পাতলা সুতি কাপড় পড়ানো যেতে পারে। ঘরের ভেতর দিয়ে বাতাস চলাচল রাখতে হবে। তবে, ফ্যান চালালেও খেয়াল রাখতে হবে যেন ফ্যানের বাতাস সরাসরি নবজাতকের গায়ে যেন না লাগে।

নবজাতকের জ্বর আছে মনে হলে কি করবেন?

নবজাতকের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৩৬.৫-৩৭.৫ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড (বা, ৯৭.৭-৯৯.৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট) । তাপমাত্রা ৩৮ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড ( ১০০.৪ ফারেনহাইট)-এর উপর গেলে তাকে জ্বর বলে। যদি জ্বর আছে মনে হয়ে তাহলে কি করবেন?  আগেই যেমন বলা হয়েছে নবজাতক নিজের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এ কারণে নবজাতকের শরীর গরম হলে প্রথমে দেখতে হবে ঘরের তাপমাত্রা বেশি কিনা বা গায়ে অতিরিক্ত কাপড় আছে কিনা। এমন হলে দরজা-জানালা খুলে দিয়ে বাতাস চলাচল বাড়িয়ে ঘরের তাপমাত্রা কমাতে হবে এবং কাপড় কমিয়ে দিতে হবে। এরপরও জ্বর আছে মনে হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন। জ্বর শিশুর ইনফেকশনের লক্ষণও হতে পারে। এবং নবজাতকের ইনফেকশন মারাত্বক আকার ধারণ করতে পারে।

এটা একটা বড় প্রবন্ধ। নবজাতক সম্পর্কে অনেক কথাই এখানে আলোচনা করেছি। তবে অনেক কথা রয়েও গেছে।  আপনার জানতে ইচ্ছা করছে এমন কোন বিষয় বাদ পড়ে গিয়ে থাকলে নিচের ফর্মটি ব্যবহার করে প্রশ্ন করুন। আমরা যথাসাধ্য উত্তর দেয়ার চেষ্টা করবো।

স্বল্প ওজনের শিশুর সমস্যা ও বিশেষ যে বিষয়গুলোতে আলাদাভাবে নজর দিতে হয় সেগুলো নিয়ে আমাদের আলাদা প্রবন্ধ আছে। সেটা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

    Leave a Comment