করোনাভাইরাসঃ গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ তথ্য

covid19 general knowledge

করোনাভাইরাসঃ গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ তথ্য

করোনাভাইরাস মহামারী চলছে। আজ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৪ কোটির উপর মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে এবং প্রায় ৩ লাখ মানুষ মৃত্যু বরণ করেছে ( ওয়ার্ল্ডোমিটার )। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে আমেরিকাতে, মৃত্যুর ক্ষেত্রেও তাই। কিন্তু অন্যান্য দেশগুলোতেও বাড়ছে যার মধ্যে বাংলাদেশও আছে। বাংলাদেশে ধীরে ধীরে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। আজ পর্যন্ত ২০ হাজারেরও উপর মানুষ এতে আক্রান্ত হয়েছে, প্রায় ৩০০ মানুষের মৃত্যুও হয়েছে। সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে করোনা ভাইরাসের রোগ বা কোভিড-১৯ রোগটি (স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ)

এই রোগের প্রতিরোধের জন্য প্রত্যেককে সচেতন থাকতে হবে এবং সব নিয়ম মেনে চলতে হবে। রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেলে সংগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। একই সাথে সচেতন থাকতে হবে যেন ইন্টারনেট থেকে পাওয়া ভুল তথ্য আমাদের ঝুকির মধ্যে ফেলে না দেয়। প্রচলিত ভুলগুলো নিয়েও আমাদের পোস্ট আছে। পড়ে দেখুন- করোনা ভাইরাসঃ প্রচলিত ভুল তথ্য

ঝুকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী

এই রোগ সবারই হতে পারে। তবে, কিছু জনগোষ্ঠীর জন্য এটি বেশি ক্ষতিকর বিবেচিত হচ্ছে। উদাহারণ হিসেবেঃ 

  • যে এলাকায় সামাজিক বিস্তার ঘটছে এমন জায়গায় বসবাসকারী 
  • কোভিড-১৯ রোগীর সংস্পর্শে এসেছে এমন ব্যক্তি
  • বয়ষ্ক ব্যক্তি বা যারা বৃদ্ধাশ্রমে থাকে এমন ব্যক্তি
  • পুরুষ
  • অন্যান্য রোগ যেমন – ডায়বেটিস, হাইপারটেনশন, হৃদরোগ, বা কিডনির রোগে ভোগা রোগী
  • ধুমপায়ী
  • ক্যান্সারের রোগী ইত্যাদি

 

লক্ষণসমুহ

করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর ৮০% লোকের কোন লক্ষণ প্রকাশ পায়না। বাকীদের মধ্যেও বেশিরভাগেরই খুবই মৃদু লক্ষণ প্রকাশ পায়। অল্প কিছু রোগীর এই রোগ মারাত্বক আকার ধারণ করে। তবে, তা ২% এরও কম। 

সাধারণ লক্ষণ গুলো নিম্নরুপ হতে পারেঃ এগুলো সাধারনভাবে বেশিরভাগ রোগীর মধ্যে (যাদের লক্ষণ প্রকাশ পায় তাদের মধ্যে) দেখা যায়ঃ

  • জ্বরঃ প্রায় ৭৭%-৯৮% রোগীর দীর্ঘ এবং অনিয়মিত জ্বর থাকে। শীত শীত লাগা বা কাপুনি থাকতে পারে। তবে, শিশুদের জ্বর নাও থাকতে পারে। 
  • কাশিঃ প্রায় ৫৭%-৮২% রোগীর শুকনা কাশি থাকে। শিশুদের নাও থাকতে পারে। 
  • শ্বাসকষ্টঃ প্রায় ১৮%-৫৭% রোগীর শ্বাসকষ্ট থাকতে পারে। সাধারাণত এটা ৫-৮ দিনের মাথায় দেখা দেয়। শিশুদের তীব্র রোগের ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট থাকতে পারে। 
  • স্বাদ ও গন্ধ না পাওয়াঃ মৃদু বা মাঝারি মাত্রার রোগে স্বাদ (প্রায় ৪৪% ক্ষেত্রে) ও গন্ধএ (প্রায় ৫৩% ক্ষেত্রে) পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।  ইউরোপিয়ান কিছু গবেষণায় আরো বেশি রোগীর ক্ষেত্রে গন্ধ ও স্বাদের পরিবর্তন পাওয়া গেছে। 

একটু অপ্রচলিত লক্ষণঃ

  • শারীরিক দুর্বলতা
  • শরীর ব্যথা
  • কফ
  • গলা ব্যথা

খুবই অপ্রচলিত লক্ষণঃ

  • পেটের সমস্যা (ক্ষুধামন্দা, বমি বমি ভাব, বমি হওয়া, পাতলা পায়খানা, পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া, পেট ব্যথা ইত্যাদি)
  • মাথা ঝিম ঝিম করা
  • মাথা ব্যথা
  • কনফিউশন/চিন্তার অস্পষ্টতা
  • সর্দি
  • রক্তবমি
  • বুকে ব্যথা
  • চোখ লাল হওয়া ইত্যাদি।

এই ভাইরাস শরীরের সব অংগপ্রত্যংগকে আক্রান্ত করে। ফলে, সব লক্ষন নিয়েই আসতে পারে। যদিও ফুসফুসের সমস্যাই বেশি বোঝা যায়। স্বাভাবিকের বাইরে কোন লক্ষণ দেখলেই আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। 

পরীক্ষা-নিরীক্ষা

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হল rt-pcr. Real-time reverse transcription polymerase chain reaction (RT-PCR)এর মাধ্যমে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়। এবং সারা পৃথিবীতেই এটাকে করোনাভাইরাস ইনফেকশন সনাক্ত করার জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে এটাকে একমাত্র সনাক্তকরণ পদ্ধতি হিসেবে নেয়া হয়েছে।

তবে, rt pcr ছাড়াও আরো বেশ কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে করোনাভাইরাস সংক্রমণ সনাক্ত করা সম্ভব। যেমনঃ 

১। রক্তের কিছু পরীক্ষা- এন্টিবডি টেস্ট, এন্টিজেন টেস্ট, বা সমন্বিত টেস্ট। Roche কোম্পানী অল্প কিছুদিন আগে একটা রক্তের টেস্ট আবিষ্কার করেছে যেটা দিয়ে সফলতার সাথে প্রায় ১০০% করোনাভাইরাস সংক্রমন নির্ণয় করা সম্ভব। একই প্রকার একটি টেস্ট বাংলাদেশের গণস্বাস্থ্য জনসমাজভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালএর ডঃ বিজন কুমার শীল আবিষ্কার করেছেন। এটার সফলতার হার এখনো নিশ্চিত না। 

২। সিটি স্ক্যানঃ বুকের সিটি স্ক্যান পরীক্ষা করেও করোনা ভাইরাস সংক্রমণ সনাক্ত করা সম্ভব। এমন কি এটি শুরুতে সনাক্ত করার ক্ষেত্রে rt pcr এর চেয়েও সফল। 

রোগীর অবস্থা বোঝার জন্য বেশ কিছু সাধারণ পরীক্ষানিরীক্ষা করার প্রয়োজন হয়ঃ

  • Pulse Oximetry
  • Arterial Blood Gas analysis
  • Complete blood count
  • Blood glucose level
  • Coagulation profile
  • C-reactive protein
  • Serum lactate dehydrogenase
  • Serum interleukin-6 level
  • Cardiac biomarkers
  • Procalcitonin
  • Comprehensive metabolic panel
  • Serum amyloid A level
  • Serum creatine kinase
  • Serum ferritin level
  • X-ray chest

চিকিৎসাঃ

দুর্ভাগ্যজনকভাবে করোনাভাইরাস সংক্রমণের সুনির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা আবিষ্কৃত হয়নি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চিকিৎসা লক্ষণের উপর নির্ভর করে দেয়া হয়। যে সমস্যা দেখা যায় তার চিকিৎসা দেয়া হয়। যেমনঃ

  • জ্বর হলে প্যারাসিটামল
  • শ্বাসকষ্ট হলে অক্সিজেন
  • শরীর ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল
  • সর্দি থাকলে এন্টিহিস্টামিন (antihistamine) – এলাট্রল, হিস্টাসিন, ফেনাডিন ইত্যাদি।
  • ব্যাকটেরিয়া দিয়ে ইনফেকশন হয়েছে মনে হলে এন্টিবায়োটিক দেয়া হয়। 

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে বেশ কিছু পরীক্ষামূলক চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এখনো কোনটাই সম্পুর্ন কার্যকর বলে প্রমাণিত হয় নি। এর মধ্যে কিছু কিছু ঝুকিপুর্ণ । কাজেই, চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত কোন ঔষধ সেবন করবেন না।

 

প্রতিরোধঃ

এধরণের রোগ প্রতিরোধের জন্য টিকা বা ভ্যাক্সিন ব্যবহার করা হয়। আমাদের দেশে এরই মধ্যে ইপিআইএর মাধ্যমে অনেকগুলো ভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকা দেয়া হচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে করোনাভাইরাস ইনফেকশনের কোন টিকা আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি।

সারা পৃথিবীতে গবেষণা চলছে। তবে, সফল হলেও তা বাংলাদেশের মানুষের কাছে পৌছতে ২০২০ সাল শেষ হয়ে যেতে পারে। কাজেই, এখন পর্যন্ত আমাদের প্রতিরোধের সবচেয়ে ভালো উপায় সতর্কতাঃ

  • সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা
  • ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত ধোয়া
  • জরুরী প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়া
  • করোনাভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ প্রকাশ পেলে ৩৩৩ বা ১৬২৬৩ ডায়াল করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া। 

এ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে চাইলে নিচের ওয়েবসাইটগুলো ভিজিট করতে পারেনঃ

করোনাভাইরাস সংক্রমন প্রতিরোধে স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

কোভিড-১৯ঃ স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

স্বাস্থ্যকর্মীদের কেন অতিরিক্ত নিরাপত্তার প্রয়োজন সেটা বোঝার জন্য প্রথমে জানতে হবে এই ভাইরাস ছড়ায় কিভাবে?

করোনা ভাইরাস মুলত স্পর্শ, রেসপিরেটরি ড্রপলেটের মাধ্যমে ছড়ায়।

১। একজন মানুষ যখন ভাইরাস আছে এমন কোন বস্তু হাতদিয়ে স্পর্শ করে তখন ভাইরাস তার হাতে চলে আসে। পরবর্তীতে যখন সে চোখ, নাক, বা মুখ স্পর্শ করে তখন এই ভাইরাস শরীরের ভিতরে প্রবেশ করে।

 ২। করোনা আক্রান্ত রোগী যখন হাচি/কাশি দেয় তখন বুক থেকে বের হয়ে বাতাসে ক্ষুদ্র কণার মত করে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী ৩-৪ ঘন্টা ঐ বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্রকণা যেই শ্বাসের সাথে নিবে সেই আক্রান্ত হয়ে পড়বে। অন্যদিকে যখন এই ক্ষুদ্রকণাগুলো নিচে পড়বে তখন আশে পাশে থাকা টেবিল, চেয়ার, বইপুস্তক ইত্যাদির উপর পড়ে থাকবে। কেউ হাত দিয়ে ধরলেই তার হাতে চলে আসবে।

 

যদি কোন চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত হন তবে তার লক্ষণ প্রকাশ পেতে সময় লাগবে ৫-১৪ দিন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ঐ সময়েও সে এই ভাইরাস ছড়াতে থাকবে। এজন্য, চিকিৎসা কর্মীদের বলা হচ্ছে সুপার স্প্রেডার। একজনই অনেক অনেক লোকের কাছে এই ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। আরো সমস্যা হল একজন চিকিৎসক রোগ ছড়াবেন অসুস্থ মানুষের মাঝে যারা এমনিতেই ঝুকির মধ্যে থাকে । ফলে , মৃত্যুর হার বেড়ে যাবে।