বিনা ঔষধে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আনুন

উচ্চ রক্তচাপে জীবনযাপন প্রনালী রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি সুস্থ্য জীবনযাপন প্রণালী মেনে চললে রক্তচাপ সহজে নিয়ন্ত্রণ থাকে। ফলে, ঔষধ না বাড়ানো, এমনকি কমানোও অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব।তাহলে, কি সেই পদক্ষেপগুলো যার ফলে রক্তচাপ কমে যায়।

১। ওজন কমান এবং কোমর চিকন রাখার চেষ্টা করুন

ওজন বাড়ার সাথে সাথে রক্তের চাপও বাড়তে থাকে। অনেক সময় ওজন বাড়ার সাথে সাথে শ্বাস সংক্রান্ত সমস্যা থাকে। সতন্ত্রভাবে এটাও রক্তচাপ বাড়ায়।

এজন্য, ওজন কমানো রক্তচাপ কমানোর ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে। যাদের ওজন বেশি, অল্প ওজন কমালেই তাদের রক্তচাপ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। সাধারণভাবে বললে, প্রতি কেজি ওজন কমানোর ফলে রক্তচাপ ১ মিমি কমে যায়।

আরেকটা কথা, শরীরের কোন জায়গায় চর্বি জমে তারও রক্তচাপের উপর প্রভাব রয়েছে। যাদের শুধু কোমরে জন্মে তাদের উচ্চরক্তচাপ বেশি দেখা যায়।

২। নিয়মিত ব্যায়াম করুন

নিয়মিত ব্যায়াম করা, যেমন- সপ্তাহে ১৫০ মিনিট বা সপ্তাহের বেশিরভাগ দিন ৩০ মিনিটের মত ব্যায়াম করা রক্তচাপ ৫-৮ মিমি রক্তচাপ কমিয়ে দিতে পারে। তবে, নিয়মিত ব্যায়াম করতে থাকা জরুরী কারণ ব্যায়াম বন্ধ করে দিলে রক্তচাপ আবার বেড়ে যেতে পারে। যদি আপনার রক্তচাপ একটু বেশির দিকে থাকে তবে ব্যায়াম করা তা কমিয়ে নিয়ে আসতে পারে।

আপনার জন্য উপযুক্ত ব্যায়াম কোনটা হতে পারে এ ব্যাপারে আপনার চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করুন।

৩। পুষ্টিকর খাবার খান

লাল আটা, ফল, শাকসবজি সমৃদ্ধ এবং কম চর্বি/কোলেস্টেরল সমৃদ্ধ খাবার খেয়ে উচ্চ রক্তচাপ কমানো সম্ভব। এর একটা নামও আছে- DASH (Dietary Approaches to Stop Hypertension) diet.

খাবারের প্রকৃতি পরিবর্তন করা সহজ নয়। কিন্তু কিছু জিনিস মেনে চললে একটা স্বাস্থ্যকর খাবারে অভ্যস্ত হওয়া সম্ভব।
ক। খাবারের হিসাব রাখুন। প্রয়োজনে লিখে রাখুন। এ হিসাব রাখলে আমরা বুঝতে পারব কোন খাবারের জন্য আমাদের ওজন বাড়ছে বা কমাতে পারছি না।
খ। পটাসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খেতে চেষ্টা করুন। সোডিয়াম বা খাবারের লবনের কারণে রক্তচাপে যে পরিবর্তন, তা পটাসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া মাধ্যমে কমানো যেতে পারে। পটাসিয়ামের সবচেয়ে ভালো উৎস ফল এবং শাকসবজি।
গ। খাবারে লবণের পরিমান কমান। পাতে লবণ খাবেন না। লবণ খাওয়া সামান্য একটু কমালেই রক্তচাপ অনেকটা কমে আসে।

৫। সব রকমের মদ এবং মদ জাতীয় পানীয় থেকে দূরে থাকুন।

৬। ধুমপান ত্যাগ করুন

প্রতিবার ধুমপানের পর বেশ কিছুক্ষণ রক্তচাপ বেশি থাকে। ধুমপান বন্ধ রাখা রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। রক্তচাপ কমানো ছাড়াও ধূমপান ত্যাগের আরো অনেক উপকারী প্রভাব আছে। কাজেই, ধূমপান ত্যাগ করুন।

৭। কফি জাতীয় পানীয় নিয়ন্ত্রণে রাখুন

যারা সচরাচর কফি খায় না, তাদের ক্ষেত্রে কফি রক্তচাপ বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে যারা নিয়মিত খায় তাদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব কম। কাজেই, বুদ্ধিমানের কাজ হবে কফি কম খাওয়া বা একেবারেই না খাওয়া। তবে, খেলে নিয়মিত অল্প খাওয়া যেতে পারে।

৮। মানসিক চাপ কমান

দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপে ভুগলে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। কাজেই, নিজের মানসিক চাপ কমাতে চেষ্টা করুন-
ক। আশা কমিয়ে দিন। সারাদিনে আপনি কি কি কাজ করবেন সে ব্যাপারে আগে থেকেই ঠিক করে নিন এবং কাজগুলো করতেই হবে এমন চিন্তা পরিহার করুন।
খ। নিজের পছন্দ অনুযায়ী যখন কোন কিছু না হয় তখন নিজেকে বোঝান। কারো পক্ষেই সবকিছু নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী করা সম্ভব হয় না। সবাইকেই কখনো না কখনো সমঝোতা করে চলতে হয়।

গ। যে বিষয়গুলো আপনার নিয়ন্ত্রণাধীন সেগুলোর দিকে মনযোগ দিন। এবং সে সমস্যা সমাধানে করনীয় কিছু থাকলে তা করুন। না থাকলে যার আছে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করুন এবং নিজে মাথা ঘামানো বন্ধ করে দিন।
ঘ। যে সকল বিষয় নিয়ে মানসিক চাপ তৈরী হয় সেগুলো এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করুন। যেমন, অফিসে একটু আগে আসতে চেষ্টা করুন। বা মাসিক বিলগুলো আগেভাগে দিয়ে দেয়ার চেষ্টা করুন। যাদের সাথে কথা হলে সমস্যা হয় তাদের এড়িয়ে চলুন। সম্ভব না হলে নিজে থেকে সমস্যাটা নিয়ে কথা বলুন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সামনাসামনি, ভদ্রভাবে কথা বলে সমাধান করা সম্ভব।
ঙ। যে কাজ করে আপনি আনন্দ পান সেটার জন্য সময় বের করুন।  নিজের শখকে গুরুত্ব দিন। আপনি ভালো থাকলে তা সবার জন্যই ভালো হবে। প্রয়োজনে নিজের স্ত্রী/স্বামীকে, সন্তানদেরকে বুঝিয়ে বলুন যে এ কাজটা করলে আপনার মানসিক চাপ কমে।
চ। বেশি বেশি ধন্যবাদ দিন/ শুকরিয়া আদায় করুন। ধন্যবাদ দিলে, অন্যের প্রশংসা করলে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নত হয় এবং তা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।

৯। বাসায় নিয়মিত রক্তচাপ মাপুন এবং ডাক্তারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন।

বাসায় রক্তচাপ মাপা রক্তচাপের পরিবর্তন দ্রুত ধরতে এবং ব্যবস্থা নিতে সাহায্য করে। একই সাথে নিজেকেও সচেতন রাখে ফলে অন্যান্য জীবনযাপনের নিয়মগুলো মানা সহজ করে দেয়।

১০। অন্যদের সাহায্য নিন।

পরিবার এবং বন্ধুবান্ধবকে আপনার রোগগুলো সম্পর্কে অবহিত রাখুন। ফলে তারাও আপনাকে সঠিক জীবনযাপনে সাহায্য করবে এবং জরুরী অবস্থায় কি করতে হবে সে সম্পর্কে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। সাপোর্ট গ্রুপের ধারনা আমাদের দেশে এখনো তেমন একটা প্রচলিত না। কিন্তু নিজের আশেপাশের অন্যান্য উচ্চরক্তচাপের রোগীদের নিয়ে গ্রুপ তৈরী করে নিতে পারেন। ফলে একে অন্যকে উপদেশ এবং উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে সহায়তা করতে পারবেন।

উচ্চরক্তচাপ একটি দীর্ঘমেয়াদী রোগ। আপনার রক্তচাপ যত বেশী নিয়ন্ত্রনে থাকবে তত কম জটিলতা তৈরী হবে। নিয়ম মেনে চলুন, ভালো থাকুন।

Leave a Comment