স্তন ক্যান্সারঃ নারীদের ১নং ঘাতক

একটা সময় ছিল আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ মারা যেত বিভিন্নরকম সংক্রামক রোগে ভুগে। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির সাথে সাথে ধীরে ধীরে রোগের ধরনেও পরিবর্তন আসছে। অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে এখন আগের চেয়ে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। এর এক কারণ হতে পারে এখন আগের চেয়ে বেশি রোগ সনাক্ত হচ্ছে অথবা হয়ত রোগের পরিমানই বেড়ে যাচ্ছে। এই রোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক হচ্ছে কর্কট রোগ (cancer)।  দেশে মৃত্যুর ১৩% হয় এই ক্যান্সার থেকে। পুরুষদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয় ফুসফুসের ক্যান্সার আর নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সার। স্তন ক্যান্সারের বিষয়ে নারীদের মধ্যে লজ্জা কাজ করে। এছাড়া সন্দেহ করতেও অনেক ক্ষেত্রে দেরি হয়ে যায়। এটা দূর করার একই রাস্তা। সচেতনতা।

কাদের স্তন ক্যান্সার বেশি হয়?

যাদের মাঝে ঝুকিগুলো বেশি থাকে তারা সাবধান ঝুকি (risk factor) মধ্যে নিচের বিষয়গুলো সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণঃ

১। মেয়েদের ঝুকি বেশি এবং বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে ঝুকি বাড়ছে; (হ্যা, ছেলেদেরও স্তন ক্যান্সার হয়, তবে সংখ্যায় খুবই কম)।

২। যাদের পরিবারে স্তন ক্যান্সারের ইতিহাস আছে তাদের ঝুকি বেশি।

৩। যাদের একবার স্তন ক্যান্সার হয়েছিল তাদের পুনরায় হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

৪। জীবনযাপন ও খাদ্যপ্রনালীঃ খাবারের মধ্যে বেশি বেশি শাকসবজি, ফলমূল, কম প্রানীজ চর্বি, এবং কম মদজাতীয় খাবার স্তন ক্যান্সারের ঝুকি কমায়। এছাড়া কম পরিশ্রম করা, সরাসরি বা অন্যউপায়ে ধূমপান ইত্যাদি ঝুকি বাড়ায়।

৫। স্থুলতা

৬। পরিবেশঃ যারা বিভিন্ন প্রকার বিষ জাতীয় রাসায়নিক (যেমন- জমিতে ব্যবহার করা কীট নাশক) ইত্যাদির সংস্পর্শে বেশি আসে তাদের ঝুকি বেশি থাকে।

স্তন ক্যান্সারের লক্ষণ কি?

স্তনে যদি কোন চাকা অনুভব করা যায় তবে তো সন্দেহ স্পষ্টই থাকে। কিন্তু কোন চাকা যদি নাও থাকে কিছু বাহ্যিক পরিবর্তন থেকে আভ্যন্তরীন অবস্থা অনেক সময়  আন্দাজ করা যায়। যেমন-

  • স্তনের আকার বা গঠনের পরিবর্তন
  • স্তনের চামড়াতে রঙএর পরিবর্তন
  • স্তনের বোটা হঠাত বসে বা ভিতরে ঢুকে যাওয়া
  • স্তনের বোটা থেকে রস/রক্ত বের হওয়া
  • বগলের নিচে হওয়া চাকা
  • ঘা তৈরী হওয়া
  • রক্ত নালী বড় হওয়া এবং দৃশ্যমান হওয়া

যদি চাকা অনুভব করা যায় যা শক্ত, অনিয়মিত গড়নের, চাকার মধ্যে ছোট ছোট চাকা অনুভত হওয়া (nodule), চামড়া আটকে থাকা (skin is fixed to underlying tissue) । এমন মনে হলে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে দেখান।

কি পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া যায়?

ব্রেস্ট ক্যান্সার আছে কি, নাই তা কিছু পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। এর মধ্যে কিছু রক্তের পরীক্ষা আছে। আর আছে কিছু মাংস কেটে করা (biopsy) মাইক্রোস্কোপের নিচে পরীক্ষা করা।

১। ম্যামোগ্রাম (mammorgram): এটা এক ধরণের এক্সরে। এর মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে স্তনের ক্যান্সার সনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়। যদি কোন সমস্যা পাওয়া যায় তবে আরো পরীক্ষা নীরিক্ষা করা হয়।

২। আলট্রাসাউন্ড (Ultrasonography):  স্তনের মধ্যে চাকা থাকলে  সাধারণত এই পরীক্ষা দেয়া হয়। এর মাধ্যমে ভিতরে পানি আছে কিনা বোঝা যায়।

৩। এমআরআই (MRI):  ব্যয়বহুল কিন্তু খুব ভালো সনাক্তকারী।

চিকিৎসা কি?

শল্যচিকিৎসা বা সার্জারীঃ  প্রাথমিক পর্যায়ে স্তন ক্যান্সার সনাক্ত হলে অপারেশন করে স্তন কেটে ফেলতে হয়। এবং সাথে বগলের নিচে যে গ্রন্থিগুলো থাকে সেগুলোও ফেলতে হয়। সার্জারী বা অপারেশনের বিভিন্ন মাত্রা থাকে। যেমন-

১। স্তন সম্পুর্ণ কেটে ফেলা ( Radical Mastectomy)

২। স্তনের অংশ কেটে ফেলা বা শুধু চাকা কেটে ফেলা (Lumpectomy)

সার্জারী করে স্তন কেটে ফেলার পর শারীরিক সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার জন্য পুনর্গঠনমূলক সার্জারীও (Reconstructive Surgery) করার প্রয়োজন হয় অনেক ক্ষেত্রে।

কেমোথেরাপিঃ বিভিন্ন রকম কেমিকেল দিয়ে স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসা করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য-

  • ক্যাপাসিটাবাইন
  • কারবোপ্লাটিন
  • সিসপ্লাটিন
  • সাইক্লোফসফামাইড
  • ডক্সোরুবিসিন ইত্যাদি।

সাধারণত একাধিক ঔষধ এক সঙ্গে দেয়া হয়।

রেডিয়েশন থেরাপিঃ এক্সরে মেশিনের মত এক বিশেষ মেশিনের মাধ্যমে রেডিয়েশন থেরাপি দেয়া হয়।

এডজুভেন্ট থেরাপিঃ আরো কিছু ঔষধ আছে যা কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, সার্জারী বা শল্য চিকিৎসার সাথে ব্যবহার করা যায়। এর মধ্যে আছে- ট্যামোক্সিফেন, এরোমেটেজ ইনহিবিটর ইত্যাদি

ফলাফল কি হয়?

স্তন ক্যান্সারের ফলাফল নির্ভর করে মুলত কত দ্রুত সনাক্ত করা এবং উপযুক্ত চিকিৎসা শুরু করা যাচ্ছে তার উপর।

সাধারণভাবে, স্তন ক্যান্সারের পর ৫ বছর বেচে থাকার হার ৯০% এবং ১০ বছর বেচে থাকার হার ৮৩%। তবে, যদি শুধু স্তনে সীমাবদ্ধ থাকে অর্থাৎ শরীরের অন্য কোথাও ছড়িয়ে না পড়ে সেক্ষেত্রে ৫ বছর পর্যন্ত বেচে থাকার হার ৯৯% পর্যন্ত হয়। যত দ্রুত সনাক্ত হবে এবং সঠিক চিকিৎসা শুরু হবে তত ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে। এ কারনেই বিশ্বব্যাপী সনাক্তকরণের উপর খুব জোর দেয়া হচ্ছে। এবং সচেতনতা বাড়ানোর জন্য চেষ্টা চলছে। 

চিকিৎসার জন্য কোথায় যাওয়া যায়?

দেশের সব স্তরেই স্তন ক্যান্সারের সনাক্তকরণের ব্যবস্থা কম বেশি আছে। উপজেলা পর্যায়েও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে শারিরীক পরীক্ষা, আল্ট্রাসনোগ্রাফী ইত্যাদির মাধ্যমে স্তন ক্যান্সার সনাক্ত করা যায়। আর, পরবর্তীতে চুড়ান্ত করা এবং চিকিৎসার জন্য মেডিকেল কলেজ, বিএসএমএমইউ (সাবেক পিজি হাসপাতাল), জাতীয় ক্যান্সার ইন্সটিটিউটে এর চিকিৎসা পাওয়া যায়।

কাজেই, নিজের বা নিজের প্রিয়জনের স্তন ক্যান্সার হতে পারে এমন সন্দেহ দেখা দিলে দেরি না করে একজন ডাক্তারের পরামর্শ নিন। 

Leave a Comment